এলিয়েন। ভিন গ্রহে প্রাণের সম্ভবনা

JENKINS ROY

   রাতের আকাশে যখন একদৃষ্টে তারাদের দিকে তাকিয়ে থাকি; মনে প্রশ্ন আসে কতদূরে রয়েছে এরা? কী হচ্ছে সেখানে? সেখানেও কি পৃথিবীর মত কোনো গ্রহ রয়েছে? থাকলে কি প্রাণ থাকতে পারে?

   কিন্তু মানুষ এখনও ভিন গ্রহে প্রাণের সন্ধান পায়নি। ইউটিউবে অনেক ভিডিও পাওয়া যায় যেখানে দেখা যায় কিছু একটা উড়ে চলে গেল যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। সেইসব আজ থাক। আজ আমরা ভাবব সত্যিই কী এলিয়েন বলে কিছু থাকতে পারে? এর সম্ভাবনা কত? কীভাবে খোঁজ পেতে পারি?

প্রথমে ভাবনা মহাকাশ নিয়ে

ক্যাসিওপিয়া         Credits: NASA/JPL-Caltech/DSS

   এলিয়েন আছে কি নেই সেটা ভাবার আগে মহাকাশ নিয়ে ভাবাটা জরুরি। মেঘমুক্ত অমাবস্যার রাতের আকাশে নয় হাজারের মত তারা দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে কেসিওপিয়া তারামন্ডলের একটি তারা রয়েছে যার নাম V762 cas; দূরত্ব 2760 আলোক বর্ষ। এটিই সবচেয়ে দূরের তারা যাকে খালি চোখে দেখা যায়। কিন্তু মহাকাশ এতটুকুই নয়। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথ দৈর্ঘ্যে অন্তত 1 লক্ষ আলোকবর্ষ আর এর মধ্যে 100 কোটি থেকে 400 কোটি তারা রয়েছে। তাদের আবার গ্রহ রয়েছে। এই এতগুলি গ্রহের মধ্যে শুধু কী পৃথিবীর মধ্যেই প্রাণ থাকবে!

  এটা তো গেল শুধু মিল্কিওয়ের কথা। 1990 সালে পাঠানো হাবল টেলিস্কোপ থেকে মহাবিশ্ব বিশালতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। হাবল মহাকাশের একটি ছোট্টো অংশের (সুচের মাথার আকারের) ছবি তুলতে থাকে প্রায় একমাস ধরে। এতে দেখা যায় ওইটুকু অংশ থেকে অন্তত 5000 ছায়াপথের আলো এসেছে। তারপর মহাকাশের অন্যান্য অংশে লক্ষ্য করে একই ফল পাওয়া গেছে। তাহলে সমগ্র মহাকাশের কথা ভাবলে কয়েক কোটি কোটি ছায়াপথ পাওয়া যাবে। পূর্বেই বলা হয়েছে  মিল্কিওয়েতে কতগুলি গ্রহ রয়েছে। তাহলে এই এতগুলি ছায়াপথে নিশ্চয়ই কয়েক ট্রিলিয়ন গ্রহ থাকবে। "এতগুলি গ্রহের মধ্যে শুধু পৃথিবীতেই প্রাণ থাকে আর অন্য কোথাও না" - কথাটাই যেন অসম্ভব মনে হচ্ছে।

এলিয়েন-এর অর্থ

    এলিয়েন (alien) শব্দের অর্থ 'অন্য গ্রহের জীব'। পৃথিবীতে কয়েকশ কোটি বছরের বিবর্তনে এক বিশাল বিভিন্নতার জীব বৈচিত্র্য তৈরি করেছে। ছোটো ব্যাকটেরিয়া যেমন জীব তেমন তিমিও একটি জীব। মানুষের মত যেমন উন্নত জীব রয়েছে তেমন রয়েছে পতঙ্গের মত নিম্ন শ্রেণির জীব রয়েছে। যদি কোনো গ্রহে প্রাণ থেকেও থাকে তাহলে তাহলে সেখানেও বিভিন্ন প্রকারের প্রাণ থাকবে। তারমানে যদি অনাবিষ্কৃত কোনো গ্রহে অণুজীব থাকে সেটিও হবে আমদের কাছে এলিয়েন।

গণিতের মাধ্যমে এলিয়েন সন্ধান

   1960 সালে ফ্রাঙ্ক ড্রেক একটি সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেন যেটা দিয়ে একটা আন্দাজ করা যাবে মিল্কিওয়েতে উপস্থিত এমন এলিয়েনের সংখ্যা যারা উন্নত যোগাযোগ করতে সক্ষম। সমীকরণটি নিম্নরূপঃ

   \(N=R*f_p*n_e*f_l*f_i*f_c*L\)

যেখানে, \(N=\) উন্নত যোগাযোগ করতে পারে এমন প্রাণের সংখ্যা।

\(R=\) প্রতিবছর গড়ে যতগুলি সুস্থিত তারা মিল্কিওয়েতে তৈরি হয় তার সংখ্যা।

\(f_p=\) গ্রহ তৈরি করতে পারে এমন তারার সংখ্যার ভগ্নাংশ।

\(n_e=\) প্রতি তারায় বসবাসযোগ্য গ্রহের সংখ্যার ভগ্নাংশ।

\(f_l=\) বসবাসযোগ্য গ্রহের ভগ্নাংশ যেখানে প্রাণ তৈরি হতে পারে।

\(f_i=\) উন্নত প্রাণ থাকতে পারে এমন গ্রহের ভগ্নাংশ মান।

\(f_c=\) উন্নত প্রাণের ভগ্নাংশ যাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত।

\(L=\) সেই সময় যতদিন ওই উন্নত প্রাণ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারবে।

   প্রথম তিনটি রাশির মান আমরা আন্দাজ করতে পারি। কিন্তু বাকীগুলি এখনও অজানা। অন্যান্যগুলি রাশিগুলির মান বের করা সহজ নয়। কারণ, \(f_l,\,f_i,\,f_c\) খুঁজতে গেলে অন্য গ্রহে প্রাণ পেতে হবে। অন্যদিকে \(L\) এর  মান আন্দাজ করা যাবে যদি আমরা আমাদের সভ্যতার স্থায়িত্বকাল জানতে পারি; যা একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই বলতে পারি, সময়ের সাথে বিস্তর গবেষণার ফলাফল হয়তো জানিয়ে দেবে আমরা একা নই। SETI সেই কাজটি চুপচাপ করে চলছে।

যদি থেকে থাকে; খুঁজে পাইনা কেন?

   কেপলার টেলিস্কোপ থেকে যতগুলি আশেপাশে অবস্থিত নক্ষত্রের গ্রহদের সম্পর্কে জানা গেছে সেটা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে মিল্কিওয়েতে কয়েক হাজার কোটি গ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে পৃথিবী সৃষ্টির নয়শ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। তাহলে পৃথিবী সৃষ্টির আগে না জানি আরো কত গ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তার মানে পৃথিবী ছাড়াও অন্যান্য গ্রহে প্রাণ সৃষ্টি সম্ভাবনা অনেক আগেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে। যদি হয়ে থাকে তাহলে এতদিনে তারা হয়তো অনেক উন্নত প্রাণে পরিণত হয়েছে। তাহলে তারা কোথায়? আমরা দেখতে পাই না কেন?

   আমাদের সভ্যতা যে হারে সময়ের সাথে উন্নত হয়েছে তা যদি বিলিয়ন বছর আগে সৃষ্ট এলিয়েনদেরও হয়ে থাকে তাহলে বর্তমান সময়ে তারা এমন পর্যায়ে পৌছাবে যা আমরা কল্পনাও করতে পারব না।

   হয়তো তাদের প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে সেটি। হয়তো তারা বিভিন্ন নক্ষত্রে নিজেদের সভ্যতা বিস্তার করেছে এবং যাযাবরের মত ঘুরে বেরাচ্ছে। কিংবা মিল্কিওয়ে ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোনো ছায়াপথে।

    আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। হয়তো আমরাই সবচেয়ে উন্নত। আমরাই হয়তো ভবিষ্যতে এক উন্নত সভ্যতা তৈরি করব যা বিভিন্ন নক্ষত্রে গিয়ে বসবাস শুরু করবে।

অবশেষে

 এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা আমাদের। কিছু প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া মুশকিল। তার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

   অন্য গ্রহে প্রাণ আছে কি নেই; নাকি আমরাই একমাত্র উন্নত প্রাণ তার উত্তর ভবিষ্যৎ বলে দেবে। কারণ প্রশ্নটির ওপর সময় একটি প্রভাবশালী অপেক্ষক।

 

সঙ্গে থাকুন ফেসবুকে

One Reply to “এলিয়েন। ভিন গ্রহে প্রাণের সম্ভবনা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *