মহাকর্ষ তরঙ্গের সারসংক্ষেপ

DEEP MITRA

   আমাদের নিউটন সাহেবের PRINCIPIA MATHEMATICA অনুযায়ী, তিনি বলেছেন মহাকর্ষ হলো একটি অদৃশ্য বল যা মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল এবং এটি বস্তুদ্বয়ের কেন্দ্র দিয়ে কাজ করে।

   কিন্তু নিউটনের মৃত্যুর প্রায় দুশত বছর পর এক জার্মান যুবক, নাম আইনস্টাইন এ কথা মানতে নারাজ। তার চিন্তার ঘোড়া দৌড়ে গেলো এমন এক পর্যায়ে যেখান থেকে তিনি বলে দিলেন নিউটন সাহেরর একটু ভুল হয়ে গিয়েছে। নিউটন সাহেব যেভাবে মহাকর্ষের ব্যাখ্যা করেছেন সেটি মোটেও তেমন নয়।

   কিন্তু তার এই কথা কেউ এমনি এমনি মানবে কেনো ? যুক্তি চাই। কী যুক্তি রয়েছে তার কাছে? সেই যুবকের কাছে যুক্তি ছিলো; তিনি বলে দিলেন মহাকর্ষ আসলে কি- তিনি বললেন যে কোনো বস্তু নিজের চারপাশের শূন্যস্থান বা স্পেস কে দুমড়ে মুচড়ে রাখে সবসময়, নিউটনের মতে একটি গ্রহ তার নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে এর কারণ হল মহাকর্ষ বল যা এদের একে ওপরের ওপর ক্রিয়াশীল।

   কিন্তু আইনস্টাইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি নক্ষত্রের উপস্থিতির জন্য তার চারপাশের স্পেস দুমড়ে গিয়ে অবস্থান করে, এবং এই মোচড়ানো স্পেসের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রহের গতিপথে স্বাভাবিক ভাবে বাঁক চলে আসে।

স্থান-কালের বক্রতা

   এসবের পর কেটে গিয়েছে অনেক দশক। মহাকর্ষ এবং সেটির তরঙ্গ নিয়ে নিয়ে গবেষণা চলেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মেধা এর খোঁজ চালিয়েছে।

   এরপর এলো সেই সময়; ২০১৬ এর ১১ই ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে 'ইউএস ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন' এর সাংবাদিক সম্মেলনে বিজ্ঞানী ডেভিড রিৎজ ঘোষনা করলেন, যে তিনি এবং তার সাথীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ কে বাগে এনেছেন।

   এবার আসা যাক এই রহস্যময়ী তরঙ্গ এর কথায়-

   কি এই তরঙ্গ? এটা কতকটা পুকুরে পাথর ফেলে দেওয়ার মত বিষয়, পুকুরে পাথর ফেলে দিলে যেমন আশেপাশের অঞ্চলে একটা ঢেউ তৈরী হয়,ঠিক সেভাবেই আমাদের মহাবিশ্বে কোনো ভারী বস্তুর নড়াচড়ার ফলে এরকম তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। তবে এক্ষেত্রে ভারী বস্তু কিন্তু মহাকর্ষের সাপেক্ষে ভারী; যেমন ধরুন ব্ল্যাক হোল কিংবা ভারী কোনো নক্ষত্র।

   এই তরঙ্গের ফলে স্পেস এ ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় অর্থাৎ স্পেস এর আয়তন বাড়ে কমে। আপনি বলবেন- বললেই মানব? কই এরকম ঝাকুনি তো কক্ষনো অনুভব হয়নি। এর কারণ রয়েছে অবশ্যই। আমি আপনি যে স্থানে আছি তার থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে এই সব তরঙ্গ উৎপত্তি হচ্ছে আর যখন এসব আমার আপনার ড্রয়িং রুমের ওপর দিয়ে যায় সেটা সাধারন ইন্দ্রিয় শক্তি দিয়ে বোঝা শক্ত হয়ে ওঠে। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন কাঁপুনি যেমন- ভূমিকম্প, সমুদ্র পৃষ্ঠে ঢেউয়ের আছাড়; এই সবের মাঝে মহাকর্ষ তরঙ্গের মত মৃদু তরঙ্গকে ('মৃদু' কথাটিও এখানে সাপেক্ষ, এই তরঙ্গ আদতে উৎপত্তিস্থলে মৃদু নয় কিন্তু পৃথিবীতে আসতে আসতে এটি ক্ষীন হয়ে যায়) বাগে আনতে স্বাভাবিক ভাবে প্রয়োজন যন্ত্রের। সেকারণেই আমেরিকায় বিজ্ঞানীরা অতি সংবেদনশীল এক যন্ত্রের ব্যবহারে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার কঠিন কাজটি করে গিয়েছেন।

LIGO     Credit- Caltech/MIT/LIGO Laboratory

   প্রকল্পের নাম- 'লেজার ইনফারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটারি' (L I G O)। পরীক্ষার পদ্ধতিটি ছিলো কিছুটা এরকম- আমেরিকার লিভিংস্টোন এবং হ্যানফোর্ড শহরে বসানো ছিলো চার কিলোমিটার লম্বা দুটো পাইপ। ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি এবং ম্যাচাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি তে বিশ্বের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা প্রায় দুদশক সময় ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সেখানে ছিলেন আমাদের ভারতীয় বিজ্ঞানীরাও।

   কয়েক দশকের নিরলশ সাধনার ফল আসলো অবশেষে। ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০১৫ তে মহাশূন্যে যখন দুটি ব্ল্যাকহোল মিশে গিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ তৈরী করেছিলো। তখন লিভিংস্টোন আর ওয়াশিংটনের দূরত্ব আর চার কিলোমিটার ছিলো না। কিছুটা বেড়ে কমে গিয়েছিলো অর্থাৎ স্পেসের আয়তন বেড়ে কমেছিল ব্যাস প্রমাণ হয়ে গেলো আইনস্টাইনই ঠিক। আসলে নিউটন বলেছিলেন যে মহাকর্ষ একটি বস্তু জোড়ার মধ্যে ক্রিয়াশীল অদৃশ্য বল কিন্তু তিনি মহাকর্ষ তরঙ্গ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি; বলেছিলেন অ্যালবার্ট। তিনি বলেছিলেন মহাকর্ষ দুই বস্তুর মধ্যে কোনো টাগ অফ ওয়ার নয়। এটি আমাদের মহাশূন্যের আয়তনের পরিবর্তন মাত্র। কোনো বস্তুর সামান্য নাড়াচাড়ার ফলে সামান্য কম্পন তৈরী হবেই এবং এর ধারনা নিউটন দিতে পারলেও তা আইনস্টাইন দিয়ে দিলেন। তবে বলে রাখি বিজ্ঞানীরা কিন্তু এই বড়ো কাজটা করে কোনো টু শব্দ করলেন না। ছয় মাস ধরে পরিসংখ্যান খুটিয়ে দ্যাখা হলো এবং শেষমেশ ১৬ এর ফেব্রুয়ারিতে তারা মুখ খুললেন।

   এই এতবড়ো কাজের পেছনে প্রচুর বিজ্ঞানীর অবদান ছিল ঠিকই কিন্তু যেই তিনজনের নাম না করলেই নয়। তারা হলেন- রেইনার ওয়েস এবং তার দুই সহকর্মী ব্যারি সি ব্যারিস এবং কিপ এস থ্রোন। সুইডিস নোবেল কমিটি এই তিন জনের নোবেল পাওয়ার বিষয় ঘোষনা করতেই বিজ্ঞান মহলে যে হইহই রব পরে যাবে সেটা স্বাভাবিক। ওয়েস এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই সাফল্যের কারন হিসেবে বলেছেন- প্রথমে সকলে এই প্রকল্পকে একটা ভুঁয়ো বিষয় বলেই ভাবত যা তাদের জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিলো। এই ত্রয়ী প্রথম থেকেই একটা কথা বলে এসেছিলেন যে এতবড়ো এক তত্ত্ব খাঁড়া করতে যে একজোট হয়ে কাজ করাটা খুব দরকার। ঠিক এই কারণেই নোবেল কমিটি তাদের সন্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

   নতুন করে আমরা দেখছি আমাদের মহাবিশ্বকে। সব কিন্তু সেই একশ বছর আগের আইনস্টানের গবেষণার জন্য। যিনি তার থিওরি অফ রিলেটিভিটি দিয়ে বলেছিলেন গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের কথা। অনেকে মানতে নারাজ ছিলেন সেই যুবকের কথা কিন্তু যারা মেনেছিলেন তারা সকলেই আজ জয়ী। ধন্য আইনস্টাইন, কুর্নিশ তোমায় জিনিয়াস।

 

সঙ্গে থাকুন ফেসবুকে

One Reply to “মহাকর্ষ তরঙ্গের সারসংক্ষেপ”

  1. ভালো লাগলো। লেখকে আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ। এই লেখাটি আমি আমার ফেজবুক পেজে দিচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *